Saturday, December 6, 2025

পৃথিবীর সব মানুষই মেয়ে হয়েই জন্মায় — ছেলেরা হয়তো কেবল বিশেষ একটি আকস্মিক জৈবিক পরিবর্তনের ফল:









আকিব হাসান সাদ :


ধরে নিন, পৃথিবীর সব মানুষই মেয়ে হয়েই জন্মায় — ছেলেরা হয়তো কেবল বিশেষ একটি আকস্মিক জৈবিক পরিবর্তনের ফল! অসম্ভব মনে হয় ?


অসম্ভব মনে হলেও, সত্যি এই যে, প্রতিটি মানব ভ্রূণ শুরুতে একটি নিরপেক্ষ বা নারীসদৃশ অবস্থায় তৈরি হয়। এবং ছেলে হবার জন্য আলাদা করে একটি জিন, একটি সংকেত আর এক বিপ্লব ঘটে শরীরের ভেতরে।

কিন্তু কেন এমন হয়? কেন প্রথমেই ছেলে নয়? কীভাবে শরীর জানে তাকে ছেলে না মেয়ে হতে হবে? এই সিদ্ধান্ত নেয় কে? 

এই লেখায় আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব— Y ক্রোমোজোমের রহস্য, SRY জিনের প্রভাব, এবং কিভাবে গর্ভের নারী কাঠামো মুছে ফেলে ছেলেকে ছেলেই বানিয়ে তোলা হয়। 



মানব দেহে লিঙ্গ নির্ধারণ শুরু হয় জন্মের অনেক আগেই—ঠিক তখনই, যখন শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু একত্রে মিলিত হয়ে একটি নতুন প্রাণের সূচনা করে। এই নিষেকের মুহূর্তেই নির্ধারিত হয় ভবিষ্যতের সন্তানের জেনেটিক লিঙ্গ: যদি দুটি X ক্রোমোসোম (XX) থাকে, তবে সেটি কন্যা; আর যদি একটি X এবং একটি Y ক্রোমোসোম (XY) থাকে, তবে সেটি পুত্রসন্তান হবে।

এই লিঙ্গ নির্ধারণের নিয়ন্ত্রণে থাকে Y ক্রোমোসোমে অবস্থিত একটি বিশেষ জিন—SRY (Sex-determining Region on Y chromosome)। এই জিনটির কাজ হলো ভ্রূণের প্রাথমিকভাবে নিরপেক্ষ বা যৌন-অসামান্য গোনাড (gonad) কে পুরুষ গোনাড অর্থাৎ অণ্ডকোষে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সংকেত দেওয়া। এটি সক্রিয় হয় ভ্রূণের গর্ভাবস্থার প্রায় ৬ষ্ঠ থেকে ৭ম সপ্তাহে। তখনই ভ্রূণের ভিতরে পুরুষাঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অনেকেই বলে থাকেন যে, প্রতিটি ভ্রূণ প্রথমে মেয়েই হয় এবং পরে Y ক্রোমোসোমের কার্যকারিতা শুরু হলে সেটি ছেলেতে রূপ নেয়। কিন্তু এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে, ভ্রূণের গঠনের প্রাথমিক কয়েকটি সপ্তাহে তার গোনাড (যা থেকে পরবর্তীতে অণ্ডকোষ বা ডিম্বাশয় তৈরি হয়) থাকে বিপোটেনশিয়াল, অর্থাৎ ছেলে বা মেয়ে হওয়ার দুটি সম্ভাবনাই খোলা থাকে। তবে ভ্রূণের জিনগত কাঠামো যদি XY হয় এবং SRY জিনটি সঠিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে সেটি পুরুষ লিঙ্গের বিকাশের পথে এগিয়ে যায়।

এটি সত্য, যে প্রথম ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত XX এবং XY উভয় ধরণের ভ্রূণের গঠন দেখতে প্রায় একই রকম থাকে। তবে এটিকে "মেয়ের মতো" বলা সঠিক নয়। এটি একটি যৌন নিরপেক্ষ বা অস্পষ্ট অবস্থা। এর মানে এই নয় যে ভ্রূণ মেয়ে ছিল এবং পরে ছেলে হয়ে গেল।

মানব ভ্রূণের বিকাশের শুরুতে দুই ধরণের প্রাথমিক প্রজনন নালীর অস্তিত্ব থাকে—একটি হলো Müllerian ducts (যা থেকে মেয়েদের প্রজনন অঙ্গ তৈরি হয়: যেমন, ফ্যালোপিয়ান টিউব, গর্ভাশয়, জরায়ুমুখ ইত্যাদি), আরেকটি হলো Wolffian ducts (যা থেকে ছেলেদের শুক্রনালীর অংশ যেমন epididymis, vas deferens, seminal vesicle তৈরি হয়)। এই উভয় নালী ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ বয়সী প্রতিটি ভ্রূণে উপস্থিত থাকে। অর্থাৎ, ভ্রূণের ক্রোমোসোম XX বা XY যাই হোক না কেন, উভয় duct system শুরুতে থেকে যায়। এই অবস্থাকে বলে bipotential phase বা যৌন-নিরপেক্ষ বিকাশ পর্যায়।

তবে এরপর শুরু হয় ক্রোমোসোম-নির্ভর পরিবর্তনের ধারা।

যদি ভ্রূণটি XY হয় এবং Y ক্রোমোসোমের SRY জিন সক্রিয় থাকে, তবে সেটি SOX9 নামক একটি transcription factor সক্রিয় করে। SOX9-এর সক্রিয়তার ফলেই গঠিত হয় Sertoli কোষ, যেগুলি পুরুষ ভ্রূণের অণ্ডকোষ গঠনের মূল ভিত্তি। এই Sertoli কোষগুলি তৈরি করতে শুরু করে একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন—Anti-Müllerian Hormone (AMH)।

AMH-এর কাজ অত্যন্ত নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ: এটি মেয়েদের reproductive tract গঠনের উৎস Müllerian duct–কে দমন করে বা ধ্বংস করে দেয়।

এখন আসি, আসলে AMH কীভাবে Müllerian duct-কে বন্ধ করে?

AMH Sertoli কোষ থেকে নিঃসৃত হয়ে পার্শ্ববর্তী মেসেনকাইমাল কোষের উপরে কাজ করে। এই কোষগুলিতে থাকে AMHR2 (Anti-Müllerian Hormone Receptor Type 2)। এই রিসেপ্টরে AMH যুক্ত হলে, SMAD2/3 pathway সক্রিয় হয়, যা সেই কোষে অ্যাপোপটোসিস (apoptosis) বা কোষ মৃত্যুর সংকেত দেয়। এর ফলে ধাপে ধাপে ভ্রূণের Müllerian duct গঠন রোধ হয় এবং অবশেষে তা সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটি ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে ঘটে থাকে এবং পুরুষ ভ্রূণে গর্ভাশয় বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের কোনো অংশ গঠিত হয় না।

যদি এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, যেমন: AMH না তৈরি হয় (যেমন Persistent Müllerian Duct Syndrome), অথবা AMHR2 রিসেপ্টর কাজ না করে, তবে XY ভ্রূণের শরীরে পুরুষ ও নারী উভয় duct-ই থেকে যেতে পারে। একে বলে intersex condition বা লিঙ্গ দ্বৈততা।

অন্যদিকে, XX ভ্রূণের ক্ষেত্রে যেহেতু SRY বা SOX9 সক্রিয় হয় না, তাই Sertoli কোষ এবং AMH তৈরি হয় না। ফলে Müllerian ducts স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়ে গর্ভাশয়, জরায়ু নালী, এবং জরায়ুমুখ তৈরি করে। সেইসাথে, Wolffian duct ধ্বংস হয়ে যায় কারণ সেখানে testosterone নামক হরমোন থাকে না যা তা ধরে রাখে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—তাহলে এই ভুল ধারণা কোথা থেকে এলো যে “সব ভ্রূণ মেয়ে হয়”? হয়তো এই বিভ্রান্তির মূল উৎস সেই ‘বাইরে থেকে দেখা’ বিষয়টি। কারণ গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে ছেলে ও মেয়ের যৌনাঙ্গে চেহারাগত পার্থক্য থাকে না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে, নিষেকের মুহূর্তেই যদি ভ্রূণে Y ক্রোমোসোম থাকে, তাহলে এটি পুরুষের দিকেই এগোবে—এবং তা কখনই মেয়ে ছিল না। এছাড়া, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে XY ভ্রূণের মধ্যে SRY জিন থাকলেও তা কোনো কারণে সঠিকভাবে কাজ করছে না—যেমন, 46,XY Gonadal Dysgenesis রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দেখতে মেয়ে হলেও তাদের ক্রোমোসোম হলো XY। আবার কিছু XX ব্যক্তি (যাদের শরীরে SRY জিন অস্বাভাবিকভাবে উপস্থিত) পুরুষের মতো বিকশিত হতে পারেন—এটি XX male syndrome নামে পরিচিত। তবে এসব ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণ নিয়ম নয়।

সম্প্রতি, একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ইঁদুরের ক্ষেত্রে যদি গর্ভাবস্থায় মা-ইঁদুরের শরীরে লৌহের ঘাটতি থাকে, তাহলে কিছু XY ভ্রূণের মধ্যে SRY ঠিকমতো কাজ না করে ফেলে এবং তারা মেয়ের মতো অঙ্গ গঠন করে ফেলে। যদিও এটি মাউস নিয়ে করা গবেষণা, এবং মানবদেহে এখনো এই রকম কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবুও এটি বোঝায় যে SRY-এর কার্যকারিতা পরিবেশগত কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করতে পারে—তবে এটি শুধুই গবেষণার স্তরে সীমাবদ্ধ।


অতএব, এই সব যুক্তি, তথ্য ও গবেষণা প্রমাণ করে যে “প্রতিটি ভ্রূণ মেয়েই হয়”—এই দাবিটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবতা হলো: প্রতিটি ভ্রূণ একটি নিরপেক্ষ যৌন পর্যায় থেকে শুরু করে, এবং তার ক্রোমোসোমাল কাঠামো ও হরমোন-নিয়ন্ত্রিত pathway নির্ধারণ করে সে ছেলে হবে নাকি মেয়ে। মেয়েদের রূপান্তরিত হওয়ার কোনো “default” অবস্থান নেই; বরং তারা একটি স্বতন্ত্র জৈবিক পথ অনুসরণ করে।


*** Sources :

1. NCBI Bookshelf: Sexual Differentiation in Humans

2. Nature Reviews Genetics: Genetic Mechanisms of Sex Determination

3. Science Direct: Role of SOX9 in Testis Development

4. MedlinePlus & PubMed: Disorders of Sex Development

5. LiveScience (2024): Mouse model iron deficiency affecting SRY

6. Wikipedia (Science-level): SRY, SOX9, Gonadal Development, XX Male Syndrome

7. Josso, N. et al. (2001). Anti-Müllerian hormone and its receptors. Molecular and Cellular Endocrinology.

8. NCBI: Development of the Reproductive System.

9. Wikipedia: Anti-Müllerian hormone

10. Endotext (NIH): Male Sexual Differentiation.

11. Sadler's Langman's Medical Embryology – Reproductive System Chapter.


#science #Embryology #গর্ভাবস্থা #লিঙ্গ #ভ্রূণ

No comments:

Post a Comment

Latest News

Finding True Friendship in the Shadows of Struggle, Amid the Spotlight of Success :

Akib Hasan Shad : When your pockets are full and your name starts to shine everywhere, the world around you suddenly changes. Your friend ...